॥ বাংলা গীতা ॥

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা — ১৮ অধ্যায় | শ্লোক • বাংলা অর্থ • সহজ ব্যাখ্যা • ভিডিও

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ১৮ অধ্যায়

অধ্যায় পড়ুন অথবা ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 1

অর্জুন বিষাদযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 2

সাংখ্যযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 4

জ্ঞানযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 5

কর্মসন্ন্যাসযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 6

ধ্যানযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 7

জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 8

অক্ষরব্রহ্মযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 9

রাজগুহ্যযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 10

বিভূতিযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 11

বিশ্বরূপ দর্শনযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 12

ভক্তিযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 13

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 14

গুণত্রয় বিভাগযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 15

পুরুষোত্তমযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 16

দৈবাসুর সম্পদ বিভাগযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 17

শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

অধ্যায় 18

মোক্ষসন্ন্যাসযোগ

অধ্যায় পড়ুন▶ ভিডিও দেখুন

গুরু বন্দনা,জয় গুরু জয় গুরু জয় গুরু জয়..শ্রীশ্রী রাম ঠাকুর (Ramthakuer Song)এর একটি ভক্তি মূলক গান ।

বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

মোক্ষসন্ন্যাসযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – অষ্টাদশ অধ্যায়)

 

মোক্ষসন্ন্যাসযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – অষ্টাদশ অধ্যায়)

মোক্ষসন্ন্যাসযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ তথা শেষ অধ্যায়। এটি সমগ্র গীতার সারসংক্ষেপ। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সন্ন্যাস, ত্যাগ, কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি, স্বধর্ম, এবং মোক্ষ সম্পর্কে চূড়ান্ত উপদেশ প্রদান করেন। এই অধ্যায়ে পূর্ববর্তী ১৭টি অধ্যায়ের মূল তত্ত্ব একত্রিত হয়েছে।


অধ্যায়ের মূল বিষয়

১. সন্ন্যাস ও ত্যাগ

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন—

  • সন্ন্যাস হলো কাম্যকর্ম (ফললাভের উদ্দেশ্যে করা কর্ম) ত্যাগ করা।

  • ত্যাগ হলো কর্মফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা।

তিনি শিক্ষা দেন যে কর্তব্যকর্ম কখনও ত্যাগ করা উচিত নয়, বরং ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে কর্ম করতে হবে।


২. কর্মের পাঁচটি কারণ

প্রত্যেক কর্ম সম্পন্ন হওয়ার পেছনে পাঁচটি কারণ রয়েছে—

  1. শরীর (অধিষ্ঠান)

  2. কর্তা

  3. বিভিন্ন ইন্দ্রিয় ও উপকরণ

  4. বিভিন্ন প্রচেষ্টা

  5. ঈশ্বর বা দৈবশক্তি

এই পাঁচটি কারণ না জেনে শুধু নিজেকে কর্তা মনে করা অজ্ঞতার লক্ষণ।


৩. জ্ঞান, কর্ম ও কর্তার তিন বিভাগ

সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ অনুসারে—

  • জ্ঞান তিন প্রকার।

  • কর্ম তিন প্রকার।

  • কর্তা তিন প্রকার।

সাত্ত্বিক জ্ঞান মানুষকে ঐক্য ও সত্য উপলব্ধি করায়, রাজসিক জ্ঞান বিভেদ সৃষ্টি করে, আর তামসিক জ্ঞান অজ্ঞানতায় আবদ্ধ রাখে।


৪. বুদ্ধি, ধৃতি ও সুখ

এই তিনটিও সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ অনুযায়ী বিভক্ত।

  • সাত্ত্বিক সুখ প্রথমে কঠিন মনে হলেও শেষে অমৃতের মতো কল্যাণকর।

  • রাজসিক সুখ প্রথমে আনন্দদায়ক হলেও শেষে দুঃখের কারণ হয়।

  • তামসিক সুখ অলসতা, নিদ্রা ও মোহ বৃদ্ধি করে।


৫. স্বধর্ম

ভগবান বলেন—

নিজের কর্তব্য পালন করা, তা ত্রুটিপূর্ণ হলেও, অন্যের কর্তব্য নিখুঁতভাবে পালন করার চেয়ে শ্রেয়।

প্রত্যেক মানুষের উচিত নিজের স্বভাব ও যোগ্যতা অনুযায়ী কর্তব্য পালন করা।


৬. সর্বোচ্চ উপদেশ (চরম শ্লোক)

গীতার সর্বাধিক প্রসিদ্ধ শ্লোকগুলির একটি—

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বা সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ॥

(১৮.৬৬)

বাংলা অর্থ:
সমস্ত ধর্মাচরণের বাহ্যিক ভেদাভেদ ত্যাগ করে একমাত্র আমার শরণ গ্রহণ করো। আমি তোমাকে সকল পাপ থেকে মুক্ত করব; কোনো শোক করো না।


অর্জুনের উপলব্ধি

ভগবানের উপদেশ শোনার পর অর্জুন বলেন—

নষ্টো মোহঃ স্মৃতির্লব্ধা ত্বত্প্রসাদান্ময়াচ্যুত।
স্থিতোऽস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব॥

(১৮.৭৩)

বাংলা অর্থ:
হে অচ্যুত! আপনার কৃপায় আমার মোহ দূর হয়েছে, স্মৃতি ফিরে এসেছে। আমি এখন সন্দেহমুক্ত ও স্থিরচিত্ত। আমি আপনার আদেশ পালন করব।


অধ্যায়ের মূল শিক্ষা

১. কর্তব্যকর্ম ত্যাগ নয়, কর্মফলের আসক্তি ত্যাগই প্রকৃত ত্যাগ।
২. নিষ্কাম কর্ম, আত্মজ্ঞান ও ভক্তি—এই তিনের সমন্বয়েই মোক্ষ লাভ সম্ভব।
৩. নিজের স্বধর্ম পালনই শ্রেষ্ঠ পথ।
৪. ঈশ্বরের প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ মানুষকে সকল ভয়, পাপ ও বন্ধন থেকে মুক্ত করে।
৫. গীতার চূড়ান্ত বার্তা হলো—ভক্তি, আত্মসমর্পণ এবং নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে পরম শান্তি ও মোক্ষ লাভ।


সারসংক্ষেপ

মোক্ষসন্ন্যাসযোগ সমগ্র শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার উপসংহার। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শিক্ষা দেন যে, মানুষ যেন ফলের আসক্তি ত্যাগ করে নিজের কর্তব্য নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, আত্মজ্ঞান অর্জন করে এবং পরমেশ্বরের প্রতি একান্ত ভক্তি ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য—মোক্ষ—লাভ করে। এই অধ্যায় গীতার সমস্ত শিক্ষাকে একসূত্রে গেঁথে মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ আধ্যাত্মিক পথনির্দেশ প্রদান করে।

শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – সপ্তদশ অধ্যায়)

 

শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – সপ্তদশ অধ্যায়)

শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের শ্রদ্ধার প্রকৃতি, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ অনুসারে তার তিনটি বিভাগ এবং সেই অনুযায়ী মানুষের উপাসনা, আহার, যজ্ঞ, তপস্যা ও দানের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন।

অধ্যায়ের প্রেক্ষাপট

অর্জুন প্রশ্ন করেন—

যারা শাস্ত্রবিধি অনুসরণ না করেও শ্রদ্ধার সঙ্গে উপাসনা করে, তাদের শ্রদ্ধার প্রকৃতি কেমন?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দেন যে, মানুষের শ্রদ্ধা তার স্বভাবজাত গুণের (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) উপর নির্ভর করে।

"যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ"
(১৭.৩)

অর্থাৎ—মানুষ যেমন শ্রদ্ধাসম্পন্ন, সে তেমনই হয়ে ওঠে।


শ্রদ্ধার তিন প্রকার

১. সাত্ত্বিক শ্রদ্ধা

  • ঈশ্বরের প্রতি বিশুদ্ধ ভক্তি।

  • শাস্ত্রসম্মত উপাসনা।

  • নিষ্কাম কর্ম।

  • সত্য, সংযম ও কল্যাণমুখী জীবন।

ফল: মনশুদ্ধি, শান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি।


২. রাজসিক শ্রদ্ধা

  • যশ, সম্মান, ক্ষমতা বা ফল লাভের উদ্দেশ্যে উপাসনা।

  • বাহ্যিক আড়ম্বরের প্রতি আকর্ষণ।

  • কর্মে ফলের প্রত্যাশা।

ফল: অস্থিরতা, আসক্তি ও মানসিক অশান্তি।


৩. তামসিক শ্রদ্ধা

  • অজ্ঞান, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস।

  • শাস্ত্রবিরুদ্ধ আচরণ।

  • নিষ্ঠুরতা ও অবিবেচনাপ্রসূত তপস্যা।

ফল: অধঃপতন ও অকল্যাণ।


আহারের তিন প্রকার

সাত্ত্বিক আহার

  • পুষ্টিকর, তাজা, সহজপাচ্য ও স্বাস্থ্যকর।

  • আয়ু, বল, স্বাস্থ্য ও আনন্দ বৃদ্ধি করে।

রাজসিক আহার

  • অতিরিক্ত ঝাল, টক, নোনতা, গরম ও উত্তেজক খাদ্য।

  • অশান্তি ও রোগের কারণ হতে পারে।

তামসিক আহার

  • বাসি, দুর্গন্ধযুক্ত, অশুচি বা নষ্ট খাদ্য।

  • অলসতা ও অজ্ঞানতা বৃদ্ধি করে।


যজ্ঞ, তপস্যা ও দান

সাত্ত্বিক

  • কর্তব্যবোধ থেকে, ফলের আশা ছাড়াই সম্পাদিত।

  • শাস্ত্রবিধি অনুসারে করা হয়।

রাজসিক

  • খ্যাতি, সম্মান বা প্রতিদানের আশায় করা হয়।

তামসিক

  • শাস্ত্রবিরুদ্ধ, অবিবেচনাপূর্ণ বা অন্যের ক্ষতির উদ্দেশ্যে করা হয়।


"ওঁ তৎ সৎ" এর তাৎপর্য

এই অধ্যায়ে ভগবান "ওঁ তৎ সৎ"-কে পরম সত্যের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

  • ওঁ — পরম ব্রহ্মের পবিত্র ধ্বনি।

  • তৎ — সব কর্ম ঈশ্বরকে উৎসর্গ করার ভাব।

  • সৎ — সত্য, শুভ ও কল্যাণকর কর্মের প্রতীক।


বিখ্যাত শ্লোক (১৭.৩)

সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত।
শ্রদ্ধাময়োऽয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ॥

বাংলা অর্থ:
হে ভারত (অর্জুন)! প্রত্যেক মানুষের শ্রদ্ধা তার অন্তঃকরণের গুণানুসারে হয়। মানুষ শ্রদ্ধাময়; সে যেমন শ্রদ্ধা পোষণ করে, তেমনই সে হয়ে ওঠে।


অধ্যায়ের মূল শিক্ষা

১. মানুষের চরিত্র তার শ্রদ্ধার প্রতিফলন।
২. বিশুদ্ধ ও শাস্ত্রসম্মত শ্রদ্ধা মানুষকে ঈশ্বরের নিকট নিয়ে যায়।
৩. আহার, যজ্ঞ, তপস্যা ও দান—সবই সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ফল দেয়।
৪. ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কর্তব্য পালনই প্রকৃত ধর্ম।
৫. "ওঁ তৎ সৎ" ভাব নিয়ে কর্ম করলে তা পবিত্র ও মুক্তিদায়ক হয়।


সারসংক্ষেপ

শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ আমাদের শেখায় যে, মানুষের জীবন তার শ্রদ্ধা দ্বারা গঠিত হয়। যে শ্রদ্ধা বিশুদ্ধ, জ্ঞানভিত্তিক ও ঈশ্বরনিষ্ঠ, তা মানুষকে শান্তি, আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির পথে পরিচালিত করে। অপরদিকে রাজসিক ও তামসিক শ্রদ্ধা আসক্তি, অজ্ঞান ও দুঃখের কারণ হয়। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের আহ্বান জানান—শাস্ত্রসম্মত জ্ঞান, নিষ্কাম কর্ম, বিশুদ্ধ ভক্তি এবং "ওঁ তৎ সৎ" ভাব নিয়ে জীবনযাপন করতে।

পুরুষোত্তমযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – পঞ্চদশ অধ্যায়)

 

পুরুষোত্তমযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – পঞ্চদশ অধ্যায়)

পুরুষোত্তমযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়। এটি গীতার অন্যতম গভীর দার্শনিক অধ্যায়। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সংসাররূপ অশ্বত্থ বৃক্ষ, ক্ষর পুরুষ, অক্ষর পুরুষ এবং পুরুষোত্তম-এর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এই অধ্যায়ের মূল উদ্দেশ্য হলো জীবকে সংসারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের শরণ গ্রহণের পথ দেখানো।

অধ্যায়ের মূল বিষয়

১. সংসাররূপ অশ্বত্থ বৃক্ষ

শ্রীকৃষ্ণ সংসারকে একটি ঊর্ধ্বমূল ও অধঃশাখাযুক্ত অশ্বত্থ (বট) বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

  • এর মূল পরমেশ্বরে প্রতিষ্ঠিত।

  • শাখা-প্রশাখা তিন গুণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) দ্বারা বিস্তৃত।

  • পাতা হলো বেদের মন্ত্র।

  • কর্ম ও বাসনার বন্ধনে জীব এই বৃক্ষে আবদ্ধ থাকে।

এই সংসারবৃক্ষকে বৈরাগ্যরূপ দৃঢ় অস্ত্র দিয়ে ছেদন করে পরম ধামের সন্ধান করতে হবে।

২. জীবাত্মার স্বরূপ

ভগবান বলেন—

  • প্রত্যেক জীব আমারই সনাতন অংশ

  • জীবাত্মা দেহ পরিবর্তন করলেও আত্মা অবিনশ্বর।

  • যেমন বায়ু ফুলের গন্ধ বহন করে, তেমনি জীবাত্মা এক দেহ থেকে অন্য দেহে ইন্দ্রিয় ও মনকে সঙ্গে নিয়ে যায়।

৩. ক্ষর, অক্ষর ও পুরুষোত্তম

ক্ষর পুরুষ

  • সমস্ত নশ্বর জীব ও জড় জগৎ।

  • জন্ম, মৃত্যু ও পরিবর্তনের অধীন।

অক্ষর পুরুষ

  • অবিনশ্বর আত্মা।

  • দেহের পরিবর্তন হলেও আত্মা চিরন্তন।

পুরুষোত্তম

  • ক্ষর ও অক্ষর উভয়ের ঊর্ধ্বে যিনি।

  • তিনিই পরমেশ্বর, সর্বস্রষ্টা, সর্বপালক ও সর্বনিয়ন্তা।

  • ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে পুরুষোত্তম হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

বিখ্যাত শ্লোক (১৫.৭)

মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।
মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি॥

বাংলা অর্থ:
এই জীবলোকে অবস্থানকারী প্রত্যেক জীবই আমারই সনাতন অংশ। সে মন ও ছয় ইন্দ্রিয়কে সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতির মধ্যে সংগ্রাম করে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক (১৫.১৫)

সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ।

বাংলা অর্থ:
আমি সকলের হৃদয়ে অবস্থান করি। স্মৃতি, জ্ঞান এবং বিস্মৃতি—সবই আমার থেকেই আসে।

অধ্যায়ের মূল শিক্ষা

১. সংসার অনিত্য; তাই এর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করা উচিত।
২. জীবাত্মা ভগবানের চিরন্তন অংশ এবং কখনও বিনষ্ট হয় না।
৩. বৈরাগ্য, আত্মজ্ঞান ও ভক্তির মাধ্যমে সংসারবন্ধন থেকে মুক্তি সম্ভব।
৪. ভগবানই সকল জ্ঞান, শক্তি ও জীবনের মূল উৎস।
৫. পুরুষোত্তম ভগবানের শরণ গ্রহণই মোক্ষ লাভের সর্বোত্তম পথ।

সারসংক্ষেপ

পুরুষোত্তমযোগ আমাদের শেখায় যে, এই সংসার ক্ষণস্থায়ী এবং কর্ম-বাসনার বন্ধনে মানুষ আবদ্ধ থাকে। বৈরাগ্য, আত্মজ্ঞান ও ভক্তির মাধ্যমে সেই বন্ধন ছিন্ন করে পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করাই জীবনের পরম লক্ষ্য। জীবাত্মা তাঁরই চিরন্তন অংশ, আর তাঁকে উপলব্ধি করলেই মানুষ জন্ম-মৃত্যুর চক্র অতিক্রম করে পরম শান্তি ও মুক্তি লাভ করে।

গুণত্রয় বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – চতুর্দশ অধ্যায়)

 

গুণত্রয় বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – চতুর্দশ অধ্যায়)

গুণত্রয় বিভাগযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতির তিনটি মৌলিক গুণ—সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এর প্রকৃতি, মানুষের জীবন ও আচরণের উপর তাদের প্রভাব এবং এই তিন গুণকে অতিক্রম করে মুক্তি লাভের উপায় ব্যাখ্যা করেছেন।

অধ্যায়ের মূল বিষয়

জগতে সমস্ত জীবই প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই তিন গুণ মানুষের চিন্তা, চরিত্র, কর্ম, সুখ-দুঃখ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।

১. সত্ত্বগুণ (পবিত্রতা ও জ্ঞানের গুণ)

বৈশিষ্ট্য:

  • পবিত্রতা

  • জ্ঞান

  • শান্তি

  • সংযম

  • সত্যনিষ্ঠা

  • করুণা

  • সন্তুষ্টি

প্রভাব:

  • মানুষকে জ্ঞান ও সুখের দিকে পরিচালিত করে।

  • মনকে শান্ত ও নির্মল রাখে।

  • ঈশ্বরচিন্তা ও আত্মউন্নতিতে সহায়তা করে।

২. রজোগুণ (কর্ম ও আসক্তির গুণ)

বৈশিষ্ট্য:

  • কর্মপ্রবণতা

  • আকাঙ্ক্ষা

  • লোভ

  • উচ্চাকাঙ্ক্ষা

  • প্রতিযোগিতা

  • অস্থিরতা

প্রভাব:

  • কর্মে উৎসাহ দেয়, কিন্তু ফলের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করে।

  • অশান্তি ও উদ্বেগ বাড়ায়।

  • সুখ-দুঃখের চক্রে আবদ্ধ রাখে।

৩. তমোগুণ (অজ্ঞান ও জড়তার গুণ)

বৈশিষ্ট্য:

  • অজ্ঞান

  • অলসতা

  • নিদ্রা

  • মোহ

  • উদাসীনতা

  • অবিবেচনা

প্রভাব:

  • মানুষকে কর্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

  • বিভ্রান্তি ও অধঃপতনের কারণ হয়।

  • আধ্যাত্মিক উন্নতিতে বাধা সৃষ্টি করে।

গুণাতীত ব্যক্তি (যিনি তিন গুণ অতিক্রম করেছেন)

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যিনি—

  • সুখ-দুঃখে সমভাবাপন্ন,

  • মান-অপমানে সমান,

  • লাভ-ক্ষতিতে বিচলিত হন না,

  • আসক্তি ও অহংকার ত্যাগ করেছেন,

  • সকলের প্রতি সমদৃষ্টি রাখেন,

  • একনিষ্ঠ ভক্তিভাবে ঈশ্বরের শরণ গ্রহণ করেন,

তিনি গুণাতীত

বিখ্যাত শ্লোক (১৪.২৬)

মাং চ যোऽব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূযায় কল্পতে॥

বাংলা অর্থ:
যে ব্যক্তি অবিচল ভক্তিযোগের মাধ্যমে আমার সেবা করে, সে এই তিন গুণকে অতিক্রম করে ব্রহ্মস্বরূপ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।

অধ্যায়ের মূল শিক্ষা

১. সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই তিন গুণ মানুষের স্বভাব ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
২. সত্ত্বগুণ উন্নতির পথ দেখালেও সেটিও এক ধরনের বন্ধন; তাই চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তিন গুণের ঊর্ধ্বে ওঠা।
৩. কর্মফলের আসক্তি, অহংকার ও অজ্ঞান ত্যাগ করলে আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব।
৪. একনিষ্ঠ ভক্তি, আত্মজ্ঞান ও সমত্ববোধ মানুষকে গুণাতীত অবস্থায় পৌঁছে দেয়।
৫. গুণাতীত অবস্থাই মুক্তি ও পরম শান্তির পথ।

সারসংক্ষেপ

গুণত্রয় বিভাগযোগ আমাদের শেখায় যে, মানুষের চরিত্র ও জীবনযাত্রা প্রকৃতির তিনটি গুণ—সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু মানুষের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল সত্ত্বগুণে উন্নীত হওয়া নয়, বরং ভক্তি, আত্মজ্ঞান ও নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে এই তিন গুণের বন্ধন অতিক্রম করা। তখনই মানুষ ব্রহ্মভাব লাভ করে এবং মোক্ষের পথে অগ্রসর হয়।

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – ত্রয়োদশ অধ্যায়)

 

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – ত্রয়োদশ অধ্যায়)

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দেহ (ক্ষেত্র), আত্মা (ক্ষেত্রজ্ঞ), প্রকৃতি, পুরুষ, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় (পরমাত্মা) সম্পর্কে গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায় আত্মজ্ঞান লাভের ভিত্তি স্থাপন করে।

অধ্যায়ের মূল বিষয়

১. ক্ষেত্র (ক্ষেত্র কী?)

ক্ষেত্র অর্থ হলো দেহ, যা কর্ম ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র।

ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত—

  • পঞ্চমহাভূত (পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ)

  • অহংকার

  • বুদ্ধি

  • অব্যক্ত প্রকৃতি

  • দশ ইন্দ্রিয়

  • মন

  • পাঁচ ইন্দ্রিয়বিষয় (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ)

  • ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, চেতনা ও ধৈর্য

২. ক্ষেত্রজ্ঞ (ক্ষেত্রজ্ঞ কে?)

ক্ষেত্রজ্ঞ হলেন যিনি দেহকে জানেন—অর্থাৎ জীবাত্মা

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, সমস্ত দেহের প্রকৃত ক্ষেত্রজ্ঞ তিনিই, অর্থাৎ পরমাত্মা সকল জীবের অন্তরে বিরাজমান।

প্রকৃত জ্ঞান (জ্ঞান)

শ্রীকৃষ্ণ বলেন, প্রকৃত জ্ঞান কেবল তথ্য জানা নয়; বরং চরিত্রের উৎকর্ষ।

প্রকৃত জ্ঞানের লক্ষণ—

  • অহংকারহীনতা

  • বিনয়

  • অহিংসা

  • ক্ষমা

  • সরলতা

  • গুরুর সেবা

  • শুচিতা

  • আত্মসংযম

  • বৈরাগ্য

  • জন্ম, মৃত্যু, বার্ধক্য ও রোগের দুঃখ উপলব্ধি

  • আসক্তিহীনতা

  • সমদৃষ্টি

  • একনিষ্ঠ ভক্তি

  • নির্জনতা প্রিয় হওয়া

  • আত্মতত্ত্বের অন্বেষণ

জ্ঞেয় (যাকে জানা উচিত)

জ্ঞেয় হলেন পরম ব্রহ্ম

  • তিনি অনাদি।

  • তিনি সর্বত্র বিরাজমান।

  • তিনি সকলের অন্তরে অবস্থান করেন।

  • তিনি জ্যোতিরও জ্যোতি।

  • তাঁকে জানলেই অমৃতত্ব লাভ হয়।

প্রকৃতি ও পুরুষ

  • প্রকৃতি থেকে দেহ, ইন্দ্রিয় ও জড় জগতের উৎপত্তি।

  • পুরুষ (আত্মা) ভোক্তা ও সাক্ষীমাত্র।

  • পরমাত্মা সর্বোচ্চ পুরুষ, যিনি সবকিছুর নিয়ন্তা।

বিখ্যাত শ্লোক (১৩.২)

ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে।
এতদ্যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ॥

বাংলা অর্থ:
হে কৌন্তেয় (অর্জুন)! এই শরীরকে ‘ক্ষেত্র’ বলা হয় এবং যিনি এই শরীরকে জানেন, জ্ঞানীগণ তাঁকে ‘ক্ষেত্রজ্ঞ’ বলে থাকেন।

অধ্যায়ের মূল শিক্ষা

১. দেহ নশ্বর, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর।
২. দেহ ও আত্মার পার্থক্য উপলব্ধি করাই আত্মজ্ঞান।
৩. প্রকৃত জ্ঞান চরিত্র, বিনয় ও আত্মসংযমে প্রকাশ পায়।
৪. পরমাত্মা সকল জীবের অন্তরে সমভাবে বিরাজমান।
৫. আত্মা ও পরমাত্মার সত্য উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ মোক্ষের পথে অগ্রসর হয়।

সারসংক্ষেপ

ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ আমাদের শেখায় যে, এই দেহ হলো কর্মের ক্ষেত্র, কিন্তু প্রকৃত পরিচয় দেহ নয়—আত্মা। আত্মা দেহের সাক্ষী, আর পরমাত্মা সকল আত্মার অন্তর্যামী। দেহ ও আত্মার পার্থক্য উপলব্ধি, বিনয়, ভক্তি, আত্মসংযম এবং পরমাত্মার জ্ঞানই মানুষের মুক্তির পথ। এই অধ্যায় আমাদের বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে চিরন্তন আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করার আহ্বান জানায়।

ভক্তিযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – দ্বাদশ অধ্যায়)

 

ভক্তিযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – দ্বাদশ অধ্যায়)

ভক্তিযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বাদশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ভক্তির প্রকৃত স্বরূপ, ভক্তির পথ এবং একজন আদর্শ ভক্তের গুণাবলি বর্ণনা করেছেন। এটি গীতার অন্যতম সহজ, হৃদয়স্পর্শী ও ব্যবহারিক অধ্যায়।

অধ্যায়ের প্রেক্ষাপট

বিশ্বরূপ দর্শনের পর অর্জুন ভগবানকে প্রশ্ন করেন—

সাকার রূপের উপাসক (যারা ভগবানের ব্যক্তিগত রূপে ভক্তি করেন) এবং নিরাকার ব্রহ্মের উপাসক—এই দুই ধরনের সাধকের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দেন যে, উভয় পথই পরম সত্যের দিকে নিয়ে যায়। তবে অধিকাংশ মানুষের জন্য প্রেম, বিশ্বাস ও আত্মসমর্পণভিত্তিক সাকার ভক্তিযোগ সহজ ও অধিক গ্রহণযোগ্য।

ভক্তিযোগের মূল শিক্ষা

  • মন ও বুদ্ধিকে ভগবানের মধ্যে নিবিষ্ট করো।

  • সর্বদা ভগবানের স্মরণ ও নামকীর্তন করো।

  • নিজের সকল কর্ম ঈশ্বরকে উৎসর্গ করো।

  • কর্মফলের প্রতি আসক্তি ত্যাগ করো।

  • সকল জীবের প্রতি দয়া, সমদৃষ্টি ও প্রেম প্রদর্শন করো।

ভক্তের প্রধান গুণাবলি

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আদর্শ ভক্তের যেসব গুণের কথা বলেছেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • সকল প্রাণীর প্রতি দ্বেষহীন।

  • মৈত্রীপূর্ণ ও করুণাময়।

  • অহংকারহীন ও বিনয়ী।

  • সুখ-দুঃখে সমভাবাপন্ন।

  • ক্ষমাশীল ও সংযমী।

  • সন্তুষ্ট ও স্থিরচিত্ত।

  • ভয়, ক্রোধ ও ঈর্ষামুক্ত।

  • সরল, সত্যনিষ্ঠ ও ঈশ্বরনিষ্ঠ।

বিখ্যাত শ্লোক (১২.১৩–১৪)

অদ্বেষ্টা সর্বভূতানাং মৈত্রঃ করুণ এব চ।
নির্মমো নিরহঙ্কারঃ সমদুঃখসুখঃ ক্ষমী॥

বাংলা অর্থ:
যিনি সকল প্রাণীর প্রতি দ্বেষহীন, সকলের বন্ধু ও করুণাময়, মমত্ব ও অহংকারহীন, সুখ-দুঃখে সমভাবাপন্ন এবং ক্ষমাশীল—তিনি ভগবানের প্রিয় ভক্ত।

ভক্তির ধাপ

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ধাপে ধাপে সহজ পথ দেখিয়েছেন—

  1. মনকে সর্বদা ভগবানের মধ্যে স্থির করো।

  2. যদি তা কঠিন হয়, নিয়মিত অভ্যাস (অভ্যাসযোগ) করো।

  3. যদি অভ্যাসও কঠিন হয়, ভগবানের উদ্দেশ্যে কর্ম করো।

  4. যদি তাও সম্ভব না হয়, কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করো।

সারসংক্ষেপ

ভক্তিযোগ শেখায় যে, প্রকৃত ভক্তি কেবল আচার-অনুষ্ঠান নয়; এটি প্রেম, আত্মসমর্পণ, দয়া, বিনয় ও নিষ্কাম কর্মের জীবনপদ্ধতি। যিনি সকলের মঙ্গল কামনা করেন, অহংকার ত্যাগ করেন এবং আন্তরিকভাবে ভগবানের শরণ গ্রহণ করেন, তিনিই ভগবানের প্রিয় ভক্ত। ভক্তিযোগের মূল বার্তা হলো—প্রেমভরে ঈশ্বরকে স্মরণ করা, তাঁর উপর নির্ভর করা এবং সকল জীবের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি উপলব্ধি করা।

বিশ্বরূপ দর্শনযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – একাদশ অধ্যায়)

 

বিশ্বরূপ দর্শনযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – একাদশ অধ্যায়)

বিশ্বরূপ দর্শনযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার একাদশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে দিব্যচক্ষু প্রদান করে তাঁর বিশ্বরূপ দর্শন করান। এটি গীতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর অধ্যায়, যেখানে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর অসীম, সর্বব্যাপী ও অনন্ত রূপ প্রকাশ করেন।

বিশ্বরূপ দর্শনের প্রেক্ষাপট

দশম অধ্যায়ে (বিভূতিযোগ) ভগবান তাঁর ঐশ্বর্য ও বিভূতির কথা বলার পর অর্জুন সেই ঐশ্বর্যময় রূপ প্রত্যক্ষ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেন যে, সাধারণ চোখে সেই রূপ দেখা সম্ভব নয়। তাই তিনি অর্জুনকে দিব্যচক্ষু প্রদান করেন।

বিশ্বরূপের বৈশিষ্ট্য

  • অসংখ্য মুখ, নয়ন, বাহু ও দিব্য অলংকারে শোভিত।

  • অসীম জ্যোতির্ময় ও সূর্যের ন্যায় দীপ্তিমান।

  • সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাঁর মধ্যেই অবস্থিত।

  • দেবতা, ঋষি, গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর—সকলেই তাঁর মধ্যে অবস্থান করছে।

  • সৃষ্টি, পালন ও সংহার—সবই তাঁর দ্বারা পরিচালিত।

অর্জুনের অনুভূতি

বিশ্বরূপ দর্শন করে অর্জুন—

  • বিস্ময়ে অভিভূত হন।

  • ভক্তিভরে প্রণাম করেন।

  • ভয় ও শ্রদ্ধায় কাঁপতে থাকেন।

  • শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর, আদিদেব ও জগতের আশ্রয় হিসেবে স্বীকার করেন।

  • পূর্বে বন্ধুর মতো সম্বোধন করার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

বিখ্যাত শ্লোক (১১.৩২)

কালোऽস্মি লোকক্ষয়কৃত্ প্রবৃদ্ধো
লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ।

বাংলা অর্থ:
আমি কাল (সময়), জগতের সংহারকারী। পৃথিবীর জীবসমূহের বিনাশের জন্য আমি আবির্ভূত হয়েছি।

এই শ্লোকটি গীতার অন্যতম বিখ্যাত শ্লোক, যা সময়ের অপরাজেয় শক্তি ও ঈশ্বরের বিশ্বনিয়ন্ত্রণের প্রতীক।

অধ্যায়ের মূল শিক্ষা

১. ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজমান এবং সমগ্র বিশ্ব তাঁরই প্রকাশ।
২. মানুষের সীমিত দৃষ্টিতে ঈশ্বরকে সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায় না; তাঁর কৃপায়ই সেই উপলব্ধি সম্ভব।
৩. সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়—সবই ঈশ্বরের নিয়ন্ত্রণে।
৪. মানুষ কেবল কর্তব্য পালন করবে; ফল ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ঈশ্বরের হাতে।
৫. ভক্তি, আত্মসমর্পণ ও ঈশ্বরবিশ্বাসই মুক্তির পথ।

সারসংক্ষেপ

বিশ্বরূপ দর্শনযোগ আমাদের শেখায় যে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেবল একজন মানবগুরু নন; তিনিই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অধীশ্বর। তাঁর মধ্যেই সমস্ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় সংঘটিত হয়। এই অধ্যায় ভক্তকে ঈশ্বরের অসীম মহিমা উপলব্ধি করতে, অহংকার ত্যাগ করতে এবং পূর্ণ ভক্তি ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে জীবনের কর্তব্য পালন করতে উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলা গীতা – শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ১৮ অধ্যায়

এই ব্লগটি সন্ধান করুন

Blogger দ্বারা পরিচালিত.

ব্লগ সংরক্ষাণাগার

মোক্ষসন্ন্যাসযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – অষ্টাদশ অধ্যায়)

  মোক্ষসন্ন্যাসযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – অষ্টাদশ অধ্যায়) মোক্ষসন্ন্যাসযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ তথা শেষ অধ্যায়। এটি সমগ্র গীতার সারসংক্...