শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চম অধ্যায় হলো কর্মসন্ন্যাসযোগ। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝান যে, কেবল বাহ্যিক কর্মত্যাগ নয়, বরং কর্মফলের আসক্তি ত্যাগই প্রকৃত সন্ন্যাস। একই সঙ্গে তিনি বলেন, নিষ্কাম কর্মই আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির পথ [web:22][web:26][web:27].
মূল শিক্ষা: সংসার ছেড়ে গেলেই সন্ন্যাস হয় না; অন্তরে আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করাই প্রকৃত সাধনা।
কর্মসন্ন্যাসযোগ কী?
কর্মসন্ন্যাসযোগ হলো এমন এক আধ্যাত্মিক শিক্ষা, যেখানে কর্ম এবং সন্ন্যাসকে বিরোধী নয়, বরং পরস্পর-সম্পর্কিত দেখা হয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, কর্মযোগ ও সন্ন্যাস উভয়ই মুক্তির পথ, কিন্তু জ্ঞানহীন মানুষের জন্য নিষ্কাম কর্মই বেশি সহজ ও শ্রেষ্ঠ [web:22][web:26].
অধ্যায়ের মূল বিষয়
কর্ম ত্যাগ নয়, কর্মফল ত্যাগই মূল কথা।
রাগ-দ্বেষমুক্ত ব্যক্তি প্রকৃত যোগী।
জ্ঞানী ব্যক্তি কর্ম ও সন্ন্যাসের গভীর সম্পর্ক বোঝেন।
যিনি কর্তব্য পালন করেন কিন্তু ফলের জন্য আকুল নন, তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন।
সংসারের মধ্যে থেকেও আত্মজ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা
“সন্ন্যাসং কর্মণাং কৃষ্ণ...” — অর্থাৎ কর্ম ত্যাগ ও কর্মযোগের মধ্যে কোনটি শ্রেয়, তা অর্জুনের এই প্রশ্নেই অধ্যায়ের আলোচনা শুরু হয়।
এই অধ্যায় আমাদের শেখায় যে জীবন থেকে দায়-দায়িত্ব পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই মনকে পরিশুদ্ধ করা উচিত। কর্মসন্ন্যাসযোগ বাস্তব জীবনে শান্তি, ভারসাম্য এবং আত্মিক উন্নতির পথ দেখায় [web:23][web:25].
কেন এই অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ কাজ করে, কিন্তু কাজের ফল নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে। কর্মসন্ন্যাসযোগ সেই দুশ্চিন্তা কমিয়ে শেখায় কীভাবে কাজকে সাধনায় রূপান্তর করা যায়। তাই এই অধ্যায় ধর্মীয় দিক থেকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জীবনের বাস্তবতার ক্ষেত্রেও মূল্যবান [web:21][web:26].
উপসংহার
অধ্যায় ৫: কর্মসন্ন্যাসযোগ আমাদের শেখায়—সন্ন্যাস মানে শুধু বনবাস বা বাহ্যিক ত্যাগ নয়, বরং অন্তরের আসক্তি ত্যাগ। যখন মানুষ নিষ্কামভাবে কর্তব্য পালন করে, তখনই তার জীবন হয়ে ওঠে শান্ত, পবিত্র ও মুক্তির পথে অগ্রসর [web:22][web:27].
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্থ অধ্যায় হলো জ্ঞানযোগ। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝান কীভাবে জ্ঞান, কর্ম ও ভক্তি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। তিনি বলেন, এই চিরন্তন যোগ প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে এবং এটি মানুষকে মুক্তির পথে এগিয়ে দেয় [web:13][web:15].
মূল শিক্ষা: সত্য জ্ঞান অর্জন করে নিষ্কামভাবে কর্ম করা এবং নিজের কর্তব্যকে ঈশ্বরচেতনায় সম্পন্ন করাই জীবনের পরম পথ।
জ্ঞানযোগ কী?
জ্ঞানযোগ হলো এমন একটি আধ্যাত্মিক পথ, যেখানে মানুষ সত্য, আত্মা, কর্ম, এবং ঈশ্বরের স্বরূপ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে। শুধু বই পড়া নয়, বরং জীবনকে সঠিকভাবে বোঝাই এই যোগের মূল কথা। শ্রীকৃষ্ণ এখানে কর্মত্যাগ নয়, বরং জ্ঞানসহ কর্ম করার শিক্ষা দেন [web:12][web:20].
অধ্যায়ের মূল বিষয়
ভগবান এই যোগের জ্ঞান প্রাচীনকাল থেকেই প্রদান করেছেন।
কর্ম, অকর্ম ও বিকর্মের পার্থক্য বোঝানো হয়েছে।
যজ্ঞের মাধ্যমে কর্মকে পবিত্র করা যায়।
অবতার তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে ধর্মরক্ষার উদ্দেশ্য বলা হয়েছে।
জ্ঞানাগ্নি দ্বারা কর্মফল দগ্ধ হয়।
গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত...” — অর্থাৎ যখনই ধর্মের অবনতি হয়, তখনই ভগবান আবির্ভূত হন।
এই শ্লোক আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ধর্ম শুধু আচার নয়, বরং ন্যায়, সত্য, দায়িত্ব ও মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত। জ্ঞানযোগ মানুষকে আত্মজ্ঞান ও নৈতিক জীবনযাপনের দিকে আহ্বান করে [web:18][web:15].
কেন এই অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের যুগে অনেকেই কর্মের চাপ, সিদ্ধান্তের দ্বিধা এবং জীবনের অর্থ নিয়ে বিভ্রান্ত হন। জ্ঞানযোগ সেই বিভ্রান্তি দূর করে সঠিক বোধ, দায়িত্ববোধ এবং আত্মিক শান্তির পথ দেখায়। তাই এই অধ্যায় শুধু ধর্মীয় নয়, বাস্তব জীবনেও অত্যন্ত মূল্যবান [web:12][web:13].
উপসংহার
অধ্যায় ৪: জ্ঞানযোগ আমাদের শেখায়—সঠিক জ্ঞানই সঠিক কর্মের ভিত্তি। যখন মানুষ সত্যকে জানে এবং নিষ্কামভাবে কর্তব্য পালন করে, তখন তার জীবন আরও শান্ত, শক্তিশালী ও আলোকিত হয় [web:13][web:20].
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার তৃতীয় অধ্যায় হলো কর্মযোগ। এই অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝান যে, মানুষ কর্ম না করে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। তাই কর্ম ত্যাগ করার চেয়ে, ফলের আশা না করে সৎভাবে কর্ম করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ [web:4][web:10].
মূল শিক্ষা: নিজের কর্তব্য পালন করো, কিন্তু ফলের প্রতি আসক্ত হয়ো না। কর্মকে ঈশ্বরার্পণ করে করাই হলো প্রকৃত যোগ।
কর্মযোগ কী?
কর্মযোগ মানে হলো নিষ্কামভাবে কাজ করা। অর্থাৎ নিজের দায়িত্ব, পেশা, পরিবার, সমাজ—সব ক্ষেত্রেই সৎ ও আন্তরিকভাবে কাজ করা, কিন্তু ব্যক্তিগত স্বার্থকে সর্বোচ্চ না রাখা। গীতার মতে, কর্মই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, আর সেই কর্মকে শুদ্ধ মনোভাব নিয়ে করলে তা আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ হয়ে ওঠে [web:6][web:10].
অধ্যায়ের মূল বক্তব্য
কর্ম করা মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম।
কর্মফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি দুঃখের কারণ হয়।
স্বধর্ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করা উচিত।
যজ্ঞের ভাবনায় কাজ করলে মন পবিত্র হয়।
কাম ও ক্রোধ মানুষকে সঠিক পথ থেকে সরিয়ে দেয়।
গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
“কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন” — অর্থাৎ তোমার অধিকার শুধু কর্মে, ফলের ওপর নয়।
এই শিক্ষা আমাদের শেখায় যে, জীবনে সাফল্য ও ব্যর্থতা দুটোই আসবে। কিন্তু সৎ চেষ্টা, দায়িত্ববোধ এবং আত্মনিবেদনই মানুষকে প্রকৃত শান্তির পথে নিয়ে যায় [web:2][web:9].
কেন এই অধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ?
আজকের ব্যস্ত জীবনে মানুষ অনেক সময় কাজের চাপ, চিন্তা, হতাশা ও অনিশ্চয়তায় ভোগে। কর্মযোগ শেখায় কীভাবে শান্ত মনে কাজ করতে হয় এবং কীভাবে নিজের কর্তব্যকে সাধনায় রূপান্তর করা যায়। তাই এই অধ্যায় শুধু ধর্মীয় নয়, বাস্তব জীবনের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ [web:4][web:10].
উপসংহার
অধ্যায় ৩: কর্মযোগ আমাদের শেখায়—কর্ম এড়ানো নয়, বরং সঠিক মনোভাব নিয়ে কর্ম করা উচিত। যখন মানুষ নিজের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে এবং ফলের আসক্তি ত্যাগ করে, তখন তার জীবন আরও শান্ত, সুন্দর ও অর্থবহ হয়ে ওঠে [web:4][web:6].
॥ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে জীবনকে আরও সৎ ও কর্মময় করে তুলুন ॥
সরলার্থঃ শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন— ভয়শূন্যতা, সরলতা, সন্তোষ, তপস্যা, যজ্ঞ, দান, দম, আক্রোধ, লােভশূন্যতা, লজ্জা, সত্য, ত্যাগ, শান্তি, স্থিরতা, শাস্ত্রপাঠ, নম্রতা, ক্ষমা, ধৈর্য, তেজঃ, শুদ্ধি, অবিরােধ, অমানিতা এই সকল দৈবভাব। ১-৩ ক্রোধ, দম্ভ, দর্প, অজ্ঞানতা, অভিমান এবং নিষ্ঠুরতা এইসব হল আসুর ভাব। ৪
মােক্ষ তরে দৈবভাব আসুরে বন্ধন।
অভিজাত তুমি পার্থ দুঃখ কি কারণ।।৫
দৈব ও আসুর জীবে দুই ভাব হয়।
দৈব বলেছি আসুর শুন ধনঞ্জয়।।৬
প্রবৃত্তি নিবৃত্তি কিছু জানে না অসুর।
সদাচার সত্য শুদ্ধি নাহিক তাহার।।৭.
ধর্মাধর্ম ঈশ্বর কভু মানে না তাহারা ।
স্ত্রী-পুরুষ সম্ভোগেই সৃষ্টি করে ধরা।।৮
সরলার্থঃ দৈব ভাব থাকলে মােক্ষলাভ হয় আর আসুর ভাব থাকলে বন্ধন ঘটে। হে অর্জুন, তুমিই শ্রেষ্ঠ-বংশজাত। এর পরেও তােমার এত দুঃখ কেন? ৫ জীবের দুইটি ভাব–দৈব ও আসুর। দৈব ভাবের কথা বলিয়াছি । আসুর ভাবের কথা বলিতেছি, শােন। ৬ অসুর প্রবৃত্তি নিবৃত্তি জানে না; তাহার সদাচার, সত্য ও শুদ্ধি কিছুই নাই । ৭ অসুরেরা সত্য, ধর্ম ও ঈশ্বর মানে না। ভােগ বাসনার পরিতৃপ্তিই তাহাদের সব। ৮
হীন নষ্টমতি অল্প বুদ্ধি নরে।
বিশ্বমাঝে জন্মে পার্থ শুধু ধ্বংস তরে।।৯
কাম মােহ মদ মান দম্ভ দুরাশায়।
শুচিহীন হয়ে তারা দুরাগ্রহে ধায়। ৷১০
আমরণ কাম চিন্তা করে মূঢ় যারা।
কামভােগ ছাড়া কিছু জানে না তাহারা।।১১
শত আশাপাশে বদ্ধ সেই মূঢ়গণ।
ভােগ তরে করে তারা অর্থ উপার্জন ৷ ৷১২
সরলার্থঃ হে অর্জুন, অল্পবুদ্ধি মানব হীন দৃষ্টি ও মতিহীন হইয়া থাকে। ধ্বংসের জন্যই তাহারা পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করিয়া থাকে । ৯ তাহারা কাম, মদ, মান, দম্ভ ও শুচিহীন হইয়া দুরাগ্রহে ধাবিত হয়। ১০ যাহারা মূঢ় তাহারা আমরণ কাম চিন্তা করে। তাহারা কামভােগ ছাড়া আর কিছুই জানে না। ১১ সেই মূর্খ ব্যক্তিরা শত আশা-পাশে বদ্ধ থাকে। তাহারা ভােগের জন্যই অর্থ উপার্জন করে। ১২
সরলার্থঃ তাহারা ভাবে- “আজ আমার এই ধন আছে, পরে আমার আরও ধন হইবে।” ১৩ তাহারা ভাবে– “আমার এই শত্রু হত হইয়াছে অপর শত্রুও নষ্ট হইবে। আমি সিদ্ধ, বলবান, ভােগী ও সুখী। আমিই ঈশ্বর।” ১৪ তাহারা অজ্ঞানতাবশত মনে করে “এই পৃথিবীতে আমি কুলীন ও ধনবান। দানে ও যজ্ঞে আমার সমান কেহ নাই ।” ১৫ ভ্রান্তচিত্ত ব্যক্তিগণ মােহজালে সমাবৃত। সর্বদা কাম ভােগে রত থাকে বলিয়া তাহারা নরকে পতিত হয়। ১৬
ধন মান মদ গর্বে গর্বিত যে জন।
বিধি ছাড়ি যজ্ঞ করে যশের কারণ।।১৭
অহংকার বল-দর্প কাম-ক্রোধ বশে।
আত্মপর ভেদ করি আমারই দ্বেষে।।১৮
ধর্মদ্বেষী ক্রূরমতি হেন অধমেরে ।
আসুরী যােনিতে ফেলি তারে বারে বারে।।১৯
আসুরী যােনিতে জন্ম লয়ে মূঢ়মতি।
আমারে পায় না লভে আরাে অধােগতি।।২০
সরলার্থঃ যে ব্যক্তি ধন, মান ও মদগর্বে গর্বিত সে বিধি ত্যাগ করিয়া যশের জন্য যজ্ঞ করে। ১৭ ঈদৃশ ব্যক্তি অহংকার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধবশে আপন পর বােধে আমাতেই ঘৃণা করে। ১৮ ঈদৃশ ব্যক্তি ধর্মদ্বেষী, ক্রূরমতি ও অধম। বারবার তাহার আসুরী যােনিতে জন্ম গ্রহণ করিতে হয়। ১৯ ঈদৃশ মূর্খ ব্যক্তি আসুর যােনিতে জন্ম গ্রহণ করিয়া আমাকে পায় না, আরাে অধােগতি লাভ করে। ২০
ত্রিবিধ নরক-দ্বার আত্ম বিনাশন।
কাম-ক্রোধ-লােভ তিনে করিবে বর্জন ৷ ৷২১
এই তিন দ্বার মুক্ত পার্থ যেই জন।
আত্মশ্রেয়ঃ সাধি পরে পরাগতি হন।।২২
ত্যজিয়া শাস্ত্রের বিধি করে স্বেচ্ছাচার।
সিদ্ধি সুখ পরাগতি কভু নাহি তার।।২৩
কর্মাকর্ম নির্ণয়েতে শাস্ত্রই প্রমাণ।
শাস্ত্র বিধি জেনে কর কর্ম অনুষ্ঠান।।২৪
সরলার্থঃ কাম, ক্রোধ ও লােভ– এই তিনটি নরকের দ্বার, ইহারা আত্মবিনাশক। ইহাদিগকে ত্যাগ কর। ২১ হে অর্জুন, যে ব্যক্তি এই তিনটি দ্বার হইতে মুক্ত, সেই ব্যক্তি আত্মার উন্নতি সাধন করতঃ উত্তম গতি লাভ করেন। ২২ যে ব্যক্তি শাস্ত্রের বিধি ত্যাগ করিয়া স্বেচ্ছাচরণ করে, সে সিদ্ধি সুখ ও পরাগতি লাভ করিতে পারে না। ২৩ শাস্ত্রীয় প্রমাণের দ্বারাই কর্ম ও অকর্ম নির্ণয় করিতে হয়। হে অর্জুন, শাস্ত্রের বিধি জানিয়া তুমি কর্ম কর। ২৪
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ষোড়শ অধ্যায়ের সার-সংক্ষেপ
জীব দুই প্রকারের স্বভাব লইয়া জন্ম গ্রহণ করে। একটি দৈব স্বভাব, অরপটি আসুর স্বভাব। ভয়াভাব, চিত্তশুদ্ধি ও আত্মজ্ঞাননিষ্ঠা প্রভৃতি দৈব স্বভাবের গুণ। আর কাম, ক্রোধ, লােভ প্রভৃতি আসুর স্বভাবের গুণ । দৈব স্বভাব মােক্ষ লাভের সহায়। আর অসুর স্বভাব বন্ধনেরকারণ হয়। শাস্ত্রবিধি অনুসারে আগে কর্তব্যাকর্তব্য নির্ণয় করিতে হইবে । তারপর ধর্ম ও লােক রক্ষার জন্য কর্ম করিলেই দৈব স্বভাব সুপ্রকাশিত হইয়া পরমেশ্বরকে ভজনা করা সহজ সাধ্য হইবে ।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের নাম “সাংখ্যযোগ”। এই অধ্যায়ে মোট ৭২টি শ্লোক রয়েছে। গীতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এটি। প্রথম অধ্যায়ে অর্জুন যুদ্ধক্ষেত্রে শোক, মোহ ও কর্তব্য সম্পর্কে সংশয়ে পতিত হয়েছিলেন। দ্বিতীয় অধ্যায়ে তিনি শ্রীকৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করেন এবং সঠিক পথনির্দেশ প্রার্থনা করেন।
এই অধ্যায় থেকেই শ্রীকৃষ্ণের মূল উপদেশ শুরু হয়। আত্মার অমরত্ব, দেহের নশ্বরতা, স্বধর্ম, নিষ্কাম কর্ম, সমত্ববুদ্ধি এবং স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ সম্পর্কে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিক্ষা দেন।
অর্জুনের শরণাগতি
অর্জুন গভীর মানসিক দ্বন্দ্বে বুঝতে পারেন যে নিজের বুদ্ধি দিয়ে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তাই তিনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে নিজেকে শিষ্যরূপে সমর্পণ করেন এবং তাঁর কাছে প্রকৃত কল্যাণের পথ জানতে চান।
অর্জুনের এই শরণাগতির পরেই শ্রীকৃষ্ণ তাঁকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রদান করতে শুরু করেন।
আত্মা অমর ও অবিনশ্বর
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে শিক্ষা দেন যে মানুষের দেহ নশ্বর হলেও আত্মা চিরন্তন, অজর ও অমর। আত্মার কখনও জন্ম হয় না এবং কখনও মৃত্যু হয় না।
মানুষ যেমন পুরোনো বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র গ্রহণ করে, তেমনি আত্মা পুরোনো দেহ ত্যাগ করে নতুন দেহ গ্রহণ করে।
অতএব দেহের পরিবর্তন ও মৃত্যুর জন্য অতিরিক্ত শোক করা জ্ঞানীর লক্ষণ নয়।
সুখ ও দুঃখ ক্ষণস্থায়ী
শ্রীকৃষ্ণ বলেন, মানুষের জীবনে সুখ-দুঃখ, শীত-উষ্ণ এবং লাভ-ক্ষতি আসে ও চলে যায়। এগুলি স্থায়ী নয়।
যিনি ধৈর্যসহকারে জীবনের পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি সহ্য করতে পারেন এবং সুখ-দুঃখে সমভাব বজায় রাখেন, তিনিই আধ্যাত্মিক উন্নতির যোগ্য হন।
স্বধর্ম ও কর্তব্য পালন
শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে তাঁর কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। একজন ক্ষত্রিয় হিসেবে ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা অর্জুনের কর্তব্য।
কর্তব্য থেকে পিছিয়ে গেলে মানুষ নিজের সম্মান ও ধর্ম উভয়ই হারাতে পারে। তাই ফলের ভয় বা ব্যক্তিগত আসক্তির কারণে নিজের ন্যায়সঙ্গত কর্তব্য ত্যাগ করা উচিত নয়।
কর্মযোগের মহান শিক্ষা
“কর্মে তোমার অধিকার আছে, কিন্তু কর্মফলে কখনও তোমার অধিকার নেই।”
শ্রীকৃষ্ণ শিক্ষা দেন যে মানুষের উচিত নিজের কর্তব্য পালন করা, কিন্তু কর্মের ফলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত না হওয়া।
সাফল্য বা ব্যর্থতার চিন্তা না করে নিষ্ঠার সঙ্গে কর্তব্য পালন করাই নিষ্কাম কর্মের মূল শিক্ষা।
সমত্বই যোগ
সাফল্য ও ব্যর্থতা, লাভ ও ক্ষতি এবং জয় ও পরাজয়ের মধ্যে সমভাব বজায় রেখে কর্ম করার শিক্ষা দিয়েছেন শ্রীকৃষ্ণ।
এই সমত্ববুদ্ধিই যোগের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফলের আসক্তি ত্যাগ করে কর্তব্য পালন করলে মানুষ মানসিক শান্তি লাভ করতে পারে।
স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি কে?
অধ্যায়ের শেষ অংশে অর্জুন জানতে চান—স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ কী?
শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যিনি মনের সমস্ত কামনা ত্যাগ করে আত্মাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, সুখে অতিরিক্ত আনন্দিত হন না, দুঃখে বিচলিত হন না এবং রাগ, ভয় ও আসক্তি থেকে মুক্ত থাকেন—তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ।
স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি কচ্ছপের মতো প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের ইন্দ্রিয়গুলিকে বিষয় থেকে সংযত করতে পারেন।
ইন্দ্রিয় আসক্তির পরিণতি
শ্রীকৃষ্ণ মানুষের পতনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতা ব্যাখ্যা করেছেন। বিষয় চিন্তা থেকে আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কামনা, কামনা থেকে ক্রোধ, ক্রোধ থেকে মোহ, মোহ থেকে স্মৃতিভ্রংশ এবং স্মৃতিভ্রংশ থেকে বুদ্ধিনাশ ঘটে।
বুদ্ধিনাশ হলে মানুষের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক পতন ঘটে। তাই মন ও ইন্দ্রিয় সংযম অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের মূল শিক্ষা
১. আত্মা অমর ও অবিনশ্বর।
২. দেহ নশ্বর ও পরিবর্তনশীল।
৩. সুখ ও দুঃখ স্থায়ী নয়।
৪. নিজের ন্যায়সঙ্গত কর্তব্য পালন করা উচিত।
৫. কর্ম করতে হবে, কিন্তু কর্মফলের প্রতি আসক্ত হওয়া উচিত নয়।
৬. সাফল্য ও ব্যর্থতায় সমভাব বজায় রাখাই যোগ।
৭. মন ও ইন্দ্রিয় সংযম আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য অপরিহার্য।
৮. স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তি সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি ও জয়-পরাজয়ে অবিচল থাকেন।
সংক্ষেপে দ্বিতীয় অধ্যায়
অধ্যায়ের নাম: সাংখ্যযোগ
অধ্যায় সংখ্যা: দ্বিতীয় অধ্যায়
মোট শ্লোক: ৭২টি
প্রধান বিষয়: আত্মার অমরত্ব, দেহের নশ্বরতা, স্বধর্ম, নিষ্কাম কর্ম, সমত্ববুদ্ধি, ইন্দ্রিয় সংযম এবং স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তির লক্ষণ।
॥ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার জ্ঞান আমাদের নিষ্কাম কর্ম, আত্মজ্ঞান ও শান্তির পথে পরিচালিত করুক।
```
Blogger-এ **New Post → HTML View**-এ code paste করুন এবং অবশ্যই Label দিন **`Chapter-2`**। তাহলে আপনার Theme-এর **“অধ্যায় পড়ুন”** button থেকে এই লেখা খোলা যাবে।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের নাম “অর্জুন বিষাদযোগ”। এই অধ্যায়ে মোট ৪৭টি শ্লোক রয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে পাণ্ডব ও কৌরব—উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে অর্জুন তাঁর আত্মীয়স্বজন, গুরুজন, বন্ধু ও পরিচিত ব্যক্তিদের বিপক্ষ শিবিরে দেখতে পান।
নিজের প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা চিন্তা করে অর্জুন গভীর শোক, দুঃখ ও মানসিক দ্বন্দ্বে পতিত হন। তাঁর হাত থেকে গাণ্ডীব ধনুক পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় এবং তিনি যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র
অধ্যায়ের শুরুতে অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের কাছে জানতে চান—ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সমবেত তাঁর পুত্রগণ এবং পাণ্ডবরা কী করছে।
সঞ্জয় তখন যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে শুরু করেন। দুর্যোধন পাণ্ডবদের বিশাল সেনাবাহিনী দেখে দ্রোণাচার্যের কাছে যান এবং উভয় পক্ষের প্রধান যোদ্ধাদের পরিচয় তুলে ধরেন।
শঙ্খধ্বনি ও যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে উভয় পক্ষের বীর যোদ্ধারা তাঁদের শঙ্খ বাজান। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পাঞ্চজন্য এবং অর্জুন দেবদত্ত নামক শঙ্খ বাজান।
সেই প্রবল শঙ্খধ্বনি সমগ্র আকাশ ও পৃথিবীকে প্রতিধ্বনিত করে তোলে।
অর্জুনের অনুরোধ
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর রথটি দুই সেনাবাহিনীর মাঝখানে নিয়ে যেতে বলেন। তিনি দেখতে চান, কারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উপস্থিত হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণ রথটি ভীষ্ম, দ্রোণ এবং অন্যান্য রাজাদের সামনে স্থাপন করেন।
অর্জুনের বিষাদ
যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের পিতামহ, গুরু, ভাই, পুত্র, পৌত্র, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনদের দেখে অর্জুন গভীর দুঃখে ভেঙে পড়েন।
তিনি বুঝতে পারেন না, রাজ্য ও সুখ লাভের জন্য নিজের আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করা কতটা যুক্তিযুক্ত।
অর্জুনের শরীর কাঁপতে থাকে, মুখ শুকিয়ে যায় এবং হাত থেকে গাণ্ডীব ধনুক পিছলে যেতে থাকে।
অর্জুনের যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত
অর্জুন মনে করেন, আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করে পাওয়া রাজ্য, সুখ বা বিজয়ের কোনো মূল্য নেই। যুদ্ধের ফলে কুলধর্ম নষ্ট হবে এবং সমাজে অধর্ম বৃদ্ধি পাবে—এই আশঙ্কাও তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করে।
অবশেষে অর্জুন শোক ও হতাশায় আক্রান্ত হয়ে ধনুক ও তীর ত্যাগ করে রথের মধ্যে বসে পড়েন।
প্রথম অধ্যায়ের মূল শিক্ষা
অর্জুন বিষাদযোগ আমাদের শেখায় যে জীবনে কখনও কখনও কর্তব্য, সম্পর্ক, আবেগ এবং নৈতিকতার মধ্যে গভীর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি দিয়ে সঠিক পথ নির্ধারণ করতে পারে না, তখন প্রয়োজন হয় যথার্থ জ্ঞান ও সঠিক পথনির্দেশের।
অর্জুনের এই বিষাদই পরবর্তী সময়ে শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অমৃতময় জ্ঞান প্রকাশের পথ তৈরি করে।
সংক্ষেপে প্রথম অধ্যায়
অধ্যায়ের নাম: অর্জুন বিষাদযোগ
অধ্যায় সংখ্যা: প্রথম অধ্যায়
মোট শ্লোক: ৪৭টি
প্রধান বিষয়: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, অর্জুনের মানসিক দ্বন্দ্ব, আত্মীয়স্বজনের প্রতি মমতা, কর্তব্য সম্পর্কে সংশয় এবং যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত।
॥ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার জ্ঞান মানুষের জীবনকে সত্য, ধর্ম ও কর্তব্যের পথে পরিচালিত করুক।