শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা প্রথম অধ্যায়
অর্জুন বিষাদযোগ
॥ ওঁ শ্রীপরমাত্মনে নমঃ ॥
অধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার প্রথম অধ্যায়ের নাম “অর্জুন বিষাদযোগ”। এই অধ্যায়ে মোট ৪৭টি শ্লোক রয়েছে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে পাণ্ডব ও কৌরব—উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে অর্জুন তাঁর আত্মীয়স্বজন, গুরুজন, বন্ধু ও পরিচিত ব্যক্তিদের বিপক্ষ শিবিরে দেখতে পান।
নিজের প্রিয়জনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কথা চিন্তা করে অর্জুন গভীর শোক, দুঃখ ও মানসিক দ্বন্দ্বে পতিত হন। তাঁর হাত থেকে গাণ্ডীব ধনুক পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয় এবং তিনি যুদ্ধ করতে অস্বীকার করেন।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্র
অধ্যায়ের শুরুতে অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্র সঞ্জয়ের কাছে জানতে চান—ধর্মক্ষেত্র কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে সমবেত তাঁর পুত্রগণ এবং পাণ্ডবরা কী করছে।
সঞ্জয় তখন যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে শুরু করেন। দুর্যোধন পাণ্ডবদের বিশাল সেনাবাহিনী দেখে দ্রোণাচার্যের কাছে যান এবং উভয় পক্ষের প্রধান যোদ্ধাদের পরিচয় তুলে ধরেন।
শঙ্খধ্বনি ও যুদ্ধের সূচনা
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বে উভয় পক্ষের বীর যোদ্ধারা তাঁদের শঙ্খ বাজান। শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পাঞ্চজন্য এবং অর্জুন দেবদত্ত নামক শঙ্খ বাজান।
সেই প্রবল শঙ্খধ্বনি সমগ্র আকাশ ও পৃথিবীকে প্রতিধ্বনিত করে তোলে।
অর্জুনের অনুরোধ
অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে তাঁর রথটি দুই সেনাবাহিনীর মাঝখানে নিয়ে যেতে বলেন। তিনি দেখতে চান, কারা তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য উপস্থিত হয়েছে।
শ্রীকৃষ্ণ রথটি ভীষ্ম, দ্রোণ এবং অন্যান্য রাজাদের সামনে স্থাপন করেন।
অর্জুনের বিষাদ
যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের পিতামহ, গুরু, ভাই, পুত্র, পৌত্র, বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনদের দেখে অর্জুন গভীর দুঃখে ভেঙে পড়েন।
তিনি বুঝতে পারেন না, রাজ্য ও সুখ লাভের জন্য নিজের আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করা কতটা যুক্তিযুক্ত।
অর্জুনের শরীর কাঁপতে থাকে, মুখ শুকিয়ে যায় এবং হাত থেকে গাণ্ডীব ধনুক পিছলে যেতে থাকে।
অর্জুনের যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত
অর্জুন মনে করেন, আত্মীয়স্বজনকে হত্যা করে পাওয়া রাজ্য, সুখ বা বিজয়ের কোনো মূল্য নেই। যুদ্ধের ফলে কুলধর্ম নষ্ট হবে এবং সমাজে অধর্ম বৃদ্ধি পাবে—এই আশঙ্কাও তাঁকে গভীরভাবে বিচলিত করে।
অবশেষে অর্জুন শোক ও হতাশায় আক্রান্ত হয়ে ধনুক ও তীর ত্যাগ করে রথের মধ্যে বসে পড়েন।
প্রথম অধ্যায়ের মূল শিক্ষা
অর্জুন বিষাদযোগ আমাদের শেখায় যে জীবনে কখনও কখনও কর্তব্য, সম্পর্ক, আবেগ এবং নৈতিকতার মধ্যে গভীর দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
মানুষ যখন নিজের বুদ্ধি দিয়ে সঠিক পথ নির্ধারণ করতে পারে না, তখন প্রয়োজন হয় যথার্থ জ্ঞান ও সঠিক পথনির্দেশের।
অর্জুনের এই বিষাদই পরবর্তী সময়ে শ্রীকৃষ্ণের মুখ থেকে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার অমৃতময় জ্ঞান প্রকাশের পথ তৈরি করে।
সংক্ষেপে প্রথম অধ্যায়
অধ্যায়ের নাম: অর্জুন বিষাদযোগ
অধ্যায় সংখ্যা: প্রথম অধ্যায়
মোট শ্লোক: ৪৭টি
প্রধান বিষয়: কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, অর্জুনের মানসিক দ্বন্দ্ব, আত্মীয়স্বজনের প্রতি মমতা, কর্তব্য সম্পর্কে সংশয় এবং যুদ্ধ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত।
॥ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ॥
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার জ্ঞান মানুষের জীবনকে সত্য, ধর্ম ও কর্তব্যের পথে পরিচালিত করুক।
.jpg)