ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – ত্রয়োদশ অধ্যায়)
ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার ত্রয়োদশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দেহ (ক্ষেত্র), আত্মা (ক্ষেত্রজ্ঞ), প্রকৃতি, পুরুষ, জ্ঞান এবং জ্ঞেয় (পরমাত্মা) সম্পর্কে গভীর তাত্ত্বিক আলোচনা করেছেন। এই অধ্যায় আত্মজ্ঞান লাভের ভিত্তি স্থাপন করে।
অধ্যায়ের মূল বিষয়
১. ক্ষেত্র (ক্ষেত্র কী?)
ক্ষেত্র অর্থ হলো দেহ, যা কর্ম ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্র।
ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত—
পঞ্চমহাভূত (পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ)
অহংকার
বুদ্ধি
অব্যক্ত প্রকৃতি
দশ ইন্দ্রিয়
মন
পাঁচ ইন্দ্রিয়বিষয় (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ)
ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, চেতনা ও ধৈর্য
২. ক্ষেত্রজ্ঞ (ক্ষেত্রজ্ঞ কে?)
ক্ষেত্রজ্ঞ হলেন যিনি দেহকে জানেন—অর্থাৎ জীবাত্মা।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, সমস্ত দেহের প্রকৃত ক্ষেত্রজ্ঞ তিনিই, অর্থাৎ পরমাত্মা সকল জীবের অন্তরে বিরাজমান।
প্রকৃত জ্ঞান (জ্ঞান)
শ্রীকৃষ্ণ বলেন, প্রকৃত জ্ঞান কেবল তথ্য জানা নয়; বরং চরিত্রের উৎকর্ষ।
প্রকৃত জ্ঞানের লক্ষণ—
অহংকারহীনতা
বিনয়
অহিংসা
ক্ষমা
সরলতা
গুরুর সেবা
শুচিতা
আত্মসংযম
বৈরাগ্য
জন্ম, মৃত্যু, বার্ধক্য ও রোগের দুঃখ উপলব্ধি
আসক্তিহীনতা
সমদৃষ্টি
একনিষ্ঠ ভক্তি
নির্জনতা প্রিয় হওয়া
আত্মতত্ত্বের অন্বেষণ
জ্ঞেয় (যাকে জানা উচিত)
জ্ঞেয় হলেন পরম ব্রহ্ম—
তিনি অনাদি।
তিনি সর্বত্র বিরাজমান।
তিনি সকলের অন্তরে অবস্থান করেন।
তিনি জ্যোতিরও জ্যোতি।
তাঁকে জানলেই অমৃতত্ব লাভ হয়।
প্রকৃতি ও পুরুষ
প্রকৃতি থেকে দেহ, ইন্দ্রিয় ও জড় জগতের উৎপত্তি।
পুরুষ (আত্মা) ভোক্তা ও সাক্ষীমাত্র।
পরমাত্মা সর্বোচ্চ পুরুষ, যিনি সবকিছুর নিয়ন্তা।
বিখ্যাত শ্লোক (১৩.২)
ইদং শরীরং কৌন্তেয় ক্ষেত্রমিত্যভিধীয়তে।
এতদ্যো বেত্তি তং প্রাহুঃ ক্ষেত্রজ্ঞ ইতি তদ্বিদঃ॥
বাংলা অর্থ:
হে কৌন্তেয় (অর্জুন)! এই শরীরকে ‘ক্ষেত্র’ বলা হয় এবং যিনি এই শরীরকে জানেন, জ্ঞানীগণ তাঁকে ‘ক্ষেত্রজ্ঞ’ বলে থাকেন।
অধ্যায়ের মূল শিক্ষা
১. দেহ নশ্বর, কিন্তু আত্মা অবিনশ্বর।
২. দেহ ও আত্মার পার্থক্য উপলব্ধি করাই আত্মজ্ঞান।
৩. প্রকৃত জ্ঞান চরিত্র, বিনয় ও আত্মসংযমে প্রকাশ পায়।
৪. পরমাত্মা সকল জীবের অন্তরে সমভাবে বিরাজমান।
৫. আত্মা ও পরমাত্মার সত্য উপলব্ধির মাধ্যমে মানুষ মোক্ষের পথে অগ্রসর হয়।
সারসংক্ষেপ
ক্ষেত্র-ক্ষেত্রজ্ঞ বিভাগযোগ আমাদের শেখায় যে, এই দেহ হলো কর্মের ক্ষেত্র, কিন্তু প্রকৃত পরিচয় দেহ নয়—আত্মা। আত্মা দেহের সাক্ষী, আর পরমাত্মা সকল আত্মার অন্তর্যামী। দেহ ও আত্মার পার্থক্য উপলব্ধি, বিনয়, ভক্তি, আত্মসংযম এবং পরমাত্মার জ্ঞানই মানুষের মুক্তির পথ। এই অধ্যায় আমাদের বাহ্যিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে চিরন্তন আত্মস্বরূপ উপলব্ধি করার আহ্বান জানায়।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন