গুণত্রয় বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – চতুর্দশ অধ্যায়)
গুণত্রয় বিভাগযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার চতুর্দশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রকৃতির তিনটি মৌলিক গুণ—সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এর প্রকৃতি, মানুষের জীবন ও আচরণের উপর তাদের প্রভাব এবং এই তিন গুণকে অতিক্রম করে মুক্তি লাভের উপায় ব্যাখ্যা করেছেন।
অধ্যায়ের মূল বিষয়
জগতে সমস্ত জীবই প্রকৃতির তিনটি গুণের দ্বারা প্রভাবিত হয়। এই তিন গুণ মানুষের চিন্তা, চরিত্র, কর্ম, সুখ-দুঃখ এবং আধ্যাত্মিক উন্নতির ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
১. সত্ত্বগুণ (পবিত্রতা ও জ্ঞানের গুণ)
বৈশিষ্ট্য:
পবিত্রতা
জ্ঞান
শান্তি
সংযম
সত্যনিষ্ঠা
করুণা
সন্তুষ্টি
প্রভাব:
মানুষকে জ্ঞান ও সুখের দিকে পরিচালিত করে।
মনকে শান্ত ও নির্মল রাখে।
ঈশ্বরচিন্তা ও আত্মউন্নতিতে সহায়তা করে।
২. রজোগুণ (কর্ম ও আসক্তির গুণ)
বৈশিষ্ট্য:
কর্মপ্রবণতা
আকাঙ্ক্ষা
লোভ
উচ্চাকাঙ্ক্ষা
প্রতিযোগিতা
অস্থিরতা
প্রভাব:
কর্মে উৎসাহ দেয়, কিন্তু ফলের প্রতি আসক্তি সৃষ্টি করে।
অশান্তি ও উদ্বেগ বাড়ায়।
সুখ-দুঃখের চক্রে আবদ্ধ রাখে।
৩. তমোগুণ (অজ্ঞান ও জড়তার গুণ)
বৈশিষ্ট্য:
অজ্ঞান
অলসতা
নিদ্রা
মোহ
উদাসীনতা
অবিবেচনা
প্রভাব:
মানুষকে কর্তব্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
বিভ্রান্তি ও অধঃপতনের কারণ হয়।
আধ্যাত্মিক উন্নতিতে বাধা সৃষ্টি করে।
গুণাতীত ব্যক্তি (যিনি তিন গুণ অতিক্রম করেছেন)
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেন, যিনি—
সুখ-দুঃখে সমভাবাপন্ন,
মান-অপমানে সমান,
লাভ-ক্ষতিতে বিচলিত হন না,
আসক্তি ও অহংকার ত্যাগ করেছেন,
সকলের প্রতি সমদৃষ্টি রাখেন,
একনিষ্ঠ ভক্তিভাবে ঈশ্বরের শরণ গ্রহণ করেন,
তিনি গুণাতীত।
বিখ্যাত শ্লোক (১৪.২৬)
মাং চ যোऽব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূযায় কল্পতে॥
বাংলা অর্থ:
যে ব্যক্তি অবিচল ভক্তিযোগের মাধ্যমে আমার সেবা করে, সে এই তিন গুণকে অতিক্রম করে ব্রহ্মস্বরূপ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে।
অধ্যায়ের মূল শিক্ষা
১. সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই তিন গুণ মানুষের স্বভাব ও আচরণকে প্রভাবিত করে।
২. সত্ত্বগুণ উন্নতির পথ দেখালেও সেটিও এক ধরনের বন্ধন; তাই চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো তিন গুণের ঊর্ধ্বে ওঠা।
৩. কর্মফলের আসক্তি, অহংকার ও অজ্ঞান ত্যাগ করলে আধ্যাত্মিক উন্নতি সম্ভব।
৪. একনিষ্ঠ ভক্তি, আত্মজ্ঞান ও সমত্ববোধ মানুষকে গুণাতীত অবস্থায় পৌঁছে দেয়।
৫. গুণাতীত অবস্থাই মুক্তি ও পরম শান্তির পথ।
সারসংক্ষেপ
গুণত্রয় বিভাগযোগ আমাদের শেখায় যে, মানুষের চরিত্র ও জীবনযাত্রা প্রকৃতির তিনটি গুণ—সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—দ্বারা পরিচালিত হয়। কিন্তু মানুষের প্রকৃত লক্ষ্য কেবল সত্ত্বগুণে উন্নীত হওয়া নয়, বরং ভক্তি, আত্মজ্ঞান ও নিষ্কাম কর্মের মাধ্যমে এই তিন গুণের বন্ধন অতিক্রম করা। তখনই মানুষ ব্রহ্মভাব লাভ করে এবং মোক্ষের পথে অগ্রসর হয়।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন