পুরুষোত্তমযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – পঞ্চদশ অধ্যায়)
পুরুষোত্তমযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার পঞ্চদশ অধ্যায়। এটি গীতার অন্যতম গভীর দার্শনিক অধ্যায়। এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সংসাররূপ অশ্বত্থ বৃক্ষ, ক্ষর পুরুষ, অক্ষর পুরুষ এবং পুরুষোত্তম-এর তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন। এই অধ্যায়ের মূল উদ্দেশ্য হলো জীবকে সংসারের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম পুরুষোত্তম ভগবানের শরণ গ্রহণের পথ দেখানো।
অধ্যায়ের মূল বিষয়
১. সংসাররূপ অশ্বত্থ বৃক্ষ
শ্রীকৃষ্ণ সংসারকে একটি ঊর্ধ্বমূল ও অধঃশাখাযুক্ত অশ্বত্থ (বট) বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এর মূল পরমেশ্বরে প্রতিষ্ঠিত।
শাখা-প্রশাখা তিন গুণ (সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ) দ্বারা বিস্তৃত।
পাতা হলো বেদের মন্ত্র।
কর্ম ও বাসনার বন্ধনে জীব এই বৃক্ষে আবদ্ধ থাকে।
এই সংসারবৃক্ষকে বৈরাগ্যরূপ দৃঢ় অস্ত্র দিয়ে ছেদন করে পরম ধামের সন্ধান করতে হবে।
২. জীবাত্মার স্বরূপ
ভগবান বলেন—
প্রত্যেক জীব আমারই সনাতন অংশ।
জীবাত্মা দেহ পরিবর্তন করলেও আত্মা অবিনশ্বর।
যেমন বায়ু ফুলের গন্ধ বহন করে, তেমনি জীবাত্মা এক দেহ থেকে অন্য দেহে ইন্দ্রিয় ও মনকে সঙ্গে নিয়ে যায়।
৩. ক্ষর, অক্ষর ও পুরুষোত্তম
ক্ষর পুরুষ
সমস্ত নশ্বর জীব ও জড় জগৎ।
জন্ম, মৃত্যু ও পরিবর্তনের অধীন।
অক্ষর পুরুষ
অবিনশ্বর আত্মা।
দেহের পরিবর্তন হলেও আত্মা চিরন্তন।
পুরুষোত্তম
ক্ষর ও অক্ষর উভয়ের ঊর্ধ্বে যিনি।
তিনিই পরমেশ্বর, সর্বস্রষ্টা, সর্বপালক ও সর্বনিয়ন্তা।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে পুরুষোত্তম হিসেবে ঘোষণা করেছেন।
বিখ্যাত শ্লোক (১৫.৭)
মমৈবাংশো জীবলোকে জীবভূতঃ সনাতনঃ।
মনঃষষ্ঠানীন্দ্রিয়াণি প্রকৃতিস্থানি কর্ষতি॥
বাংলা অর্থ:
এই জীবলোকে অবস্থানকারী প্রত্যেক জীবই আমারই সনাতন অংশ। সে মন ও ছয় ইন্দ্রিয়কে সঙ্গে নিয়ে প্রকৃতির মধ্যে সংগ্রাম করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শ্লোক (১৫.১৫)
সর্বস্য চাহং হৃদি সন্নিবিষ্টো
মত্তঃ স্মৃতির্জ্ঞানমপোহনং চ।
বাংলা অর্থ:
আমি সকলের হৃদয়ে অবস্থান করি। স্মৃতি, জ্ঞান এবং বিস্মৃতি—সবই আমার থেকেই আসে।
অধ্যায়ের মূল শিক্ষা
১. সংসার অনিত্য; তাই এর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি ত্যাগ করা উচিত।
২. জীবাত্মা ভগবানের চিরন্তন অংশ এবং কখনও বিনষ্ট হয় না।
৩. বৈরাগ্য, আত্মজ্ঞান ও ভক্তির মাধ্যমে সংসারবন্ধন থেকে মুক্তি সম্ভব।
৪. ভগবানই সকল জ্ঞান, শক্তি ও জীবনের মূল উৎস।
৫. পুরুষোত্তম ভগবানের শরণ গ্রহণই মোক্ষ লাভের সর্বোত্তম পথ।
সারসংক্ষেপ
পুরুষোত্তমযোগ আমাদের শেখায় যে, এই সংসার ক্ষণস্থায়ী এবং কর্ম-বাসনার বন্ধনে মানুষ আবদ্ধ থাকে। বৈরাগ্য, আত্মজ্ঞান ও ভক্তির মাধ্যমে সেই বন্ধন ছিন্ন করে পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করাই জীবনের পরম লক্ষ্য। জীবাত্মা তাঁরই চিরন্তন অংশ, আর তাঁকে উপলব্ধি করলেই মানুষ জন্ম-মৃত্যুর চক্র অতিক্রম করে পরম শান্তি ও মুক্তি লাভ করে।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন