শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা – সপ্তদশ অধ্যায়)
শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার সপ্তদশ অধ্যায়। এই অধ্যায়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মানুষের শ্রদ্ধার প্রকৃতি, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ অনুসারে তার তিনটি বিভাগ এবং সেই অনুযায়ী মানুষের উপাসনা, আহার, যজ্ঞ, তপস্যা ও দানের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করেছেন।
অধ্যায়ের প্রেক্ষাপট
অর্জুন প্রশ্ন করেন—
যারা শাস্ত্রবিধি অনুসরণ না করেও শ্রদ্ধার সঙ্গে উপাসনা করে, তাদের শ্রদ্ধার প্রকৃতি কেমন?
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দেন যে, মানুষের শ্রদ্ধা তার স্বভাবজাত গুণের (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ) উপর নির্ভর করে।
"যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ"
(১৭.৩)
অর্থাৎ—মানুষ যেমন শ্রদ্ধাসম্পন্ন, সে তেমনই হয়ে ওঠে।
শ্রদ্ধার তিন প্রকার
১. সাত্ত্বিক শ্রদ্ধা
ঈশ্বরের প্রতি বিশুদ্ধ ভক্তি।
শাস্ত্রসম্মত উপাসনা।
নিষ্কাম কর্ম।
সত্য, সংযম ও কল্যাণমুখী জীবন।
ফল: মনশুদ্ধি, শান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি।
২. রাজসিক শ্রদ্ধা
যশ, সম্মান, ক্ষমতা বা ফল লাভের উদ্দেশ্যে উপাসনা।
বাহ্যিক আড়ম্বরের প্রতি আকর্ষণ।
কর্মে ফলের প্রত্যাশা।
ফল: অস্থিরতা, আসক্তি ও মানসিক অশান্তি।
৩. তামসিক শ্রদ্ধা
অজ্ঞান, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস।
শাস্ত্রবিরুদ্ধ আচরণ।
নিষ্ঠুরতা ও অবিবেচনাপ্রসূত তপস্যা।
ফল: অধঃপতন ও অকল্যাণ।
আহারের তিন প্রকার
সাত্ত্বিক আহার
পুষ্টিকর, তাজা, সহজপাচ্য ও স্বাস্থ্যকর।
আয়ু, বল, স্বাস্থ্য ও আনন্দ বৃদ্ধি করে।
রাজসিক আহার
অতিরিক্ত ঝাল, টক, নোনতা, গরম ও উত্তেজক খাদ্য।
অশান্তি ও রোগের কারণ হতে পারে।
তামসিক আহার
বাসি, দুর্গন্ধযুক্ত, অশুচি বা নষ্ট খাদ্য।
অলসতা ও অজ্ঞানতা বৃদ্ধি করে।
যজ্ঞ, তপস্যা ও দান
সাত্ত্বিক
কর্তব্যবোধ থেকে, ফলের আশা ছাড়াই সম্পাদিত।
শাস্ত্রবিধি অনুসারে করা হয়।
রাজসিক
খ্যাতি, সম্মান বা প্রতিদানের আশায় করা হয়।
তামসিক
শাস্ত্রবিরুদ্ধ, অবিবেচনাপূর্ণ বা অন্যের ক্ষতির উদ্দেশ্যে করা হয়।
"ওঁ তৎ সৎ" এর তাৎপর্য
এই অধ্যায়ে ভগবান "ওঁ তৎ সৎ"-কে পরম সত্যের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ওঁ — পরম ব্রহ্মের পবিত্র ধ্বনি।
তৎ — সব কর্ম ঈশ্বরকে উৎসর্গ করার ভাব।
সৎ — সত্য, শুভ ও কল্যাণকর কর্মের প্রতীক।
বিখ্যাত শ্লোক (১৭.৩)
সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত।
শ্রদ্ধাময়োऽয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ॥
বাংলা অর্থ:
হে ভারত (অর্জুন)! প্রত্যেক মানুষের শ্রদ্ধা তার অন্তঃকরণের গুণানুসারে হয়। মানুষ শ্রদ্ধাময়; সে যেমন শ্রদ্ধা পোষণ করে, তেমনই সে হয়ে ওঠে।
অধ্যায়ের মূল শিক্ষা
১. মানুষের চরিত্র তার শ্রদ্ধার প্রতিফলন।
২. বিশুদ্ধ ও শাস্ত্রসম্মত শ্রদ্ধা মানুষকে ঈশ্বরের নিকট নিয়ে যায়।
৩. আহার, যজ্ঞ, তপস্যা ও দান—সবই সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ফল দেয়।
৪. ফলের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে কর্তব্য পালনই প্রকৃত ধর্ম।
৫. "ওঁ তৎ সৎ" ভাব নিয়ে কর্ম করলে তা পবিত্র ও মুক্তিদায়ক হয়।
সারসংক্ষেপ
শ্রদ্ধাত্রয় বিভাগযোগ আমাদের শেখায় যে, মানুষের জীবন তার শ্রদ্ধা দ্বারা গঠিত হয়। যে শ্রদ্ধা বিশুদ্ধ, জ্ঞানভিত্তিক ও ঈশ্বরনিষ্ঠ, তা মানুষকে শান্তি, আত্মশুদ্ধি ও মুক্তির পথে পরিচালিত করে। অপরদিকে রাজসিক ও তামসিক শ্রদ্ধা আসক্তি, অজ্ঞান ও দুঃখের কারণ হয়। তাই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ আমাদের আহ্বান জানান—শাস্ত্রসম্মত জ্ঞান, নিষ্কাম কর্ম, বিশুদ্ধ ভক্তি এবং "ওঁ তৎ সৎ" ভাব নিয়ে জীবনযাপন করতে।
.jpg)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন